ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শিশু হত্যার রহস্য ২৪ ঘণ্টায় উন্মোচিত: তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন

 ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শিশু হত্যার রহস্য ২৪ ঘণ্টায় উন্মোচিত: তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন



জহির শাহ্,

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি,

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬


ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোহনপুর গ্রামে নেমে এসেছে এক ভারী নীরবতা। ছয় বছরের শিশু নিশাত জাহানের মৃত্যু এখন আর কেবল একটি ফৌজদারি ঘটনা নয়; এটি সমাজের ভেতরের নিরাপত্তা দুর্বলতা, নৈতিক স্খলন এবং মানবিক ব্যর্থতার এক গভীর প্রতিচ্ছবি।

প্রবাসী আবু সাদেক মিয়ার কন্যা নিশাত স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনের নার্সারি শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৫ এপ্রিল বিকেলে বাড়ির পাশের দোকানে চিপস কিনতে গিয়ে সে আর ফিরে আসেনি। পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘ অনুসন্ধান ও উদ্বেগের পরও তার কোনো সন্ধান মেলেনি।

দুই দিন পর, ১৭ এপ্রিল দুপুরে, বাড়ির কাছাকাছি একটি নির্জন স্থানে বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় এক ব্যক্তি বস্তাটি দেখতে পেয়ে বিষয়টি জানালে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পোশাক দেখে মরদেহ শনাক্ত করেন।

ঘটনার পর নিহতের মা আকলিমা আক্তার সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্তভার গ্রহণ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তারা মূল সন্দেহভাজনের অবস্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।

তদন্তে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য—ঘটনার সঙ্গে জড়িত ইসহাক মিয়া (২৯), যিনি নিহত শিশুটির প্রতিবেশী। প্রথমদিকে তিনি সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও মোবাইল লোকেশন বিশ্লেষণে ঘটনাস্থলের আশপাশে তার উপস্থিতি প্রমাণিত হয়। এরপর ১৮ এপ্রিল তাকে নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে ইসহাক মিয়া হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলে জানায় তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র। তার ভাষ্যমতে, শিশুটিকে প্রথমে প্রলোভন দেখিয়ে একটি পার্কে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে নিজ বাড়িতে আনা হয়। সেখানে অনৈতিক আচরণের চেষ্টা করলে শিশুটি বাধা দেয় এবং পরিবারকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বলে। এতে আতঙ্কিত হয়ে সে শিশুটির গলায় চাপ প্রয়োগ করে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরবর্তীতে মরদেহ বস্তাবন্দি করে নির্জন স্থানে ফেলে দেয়।

পিবিআই তার দেখানো মতে হত্যায় ব্যবহৃত একটি গেঞ্জি উদ্ধার করেছে। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, এ ঘটনায় সে একাই জড়িত ছিল; তবে বিষয়টি এখনো যাচাইাধীন।

ঘটনার পর এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযুক্তকে ঘটনাস্থলে নেওয়ার সময় জনতা তার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে এবং একটি অটোরিকশা পুড়িয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।

১৮ এপ্রিল ময়নাতদন্ত শেষে শিশুটির মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং দাফন সম্পন্ন হয়।


এই ঘটনা দ্রুত উদঘাটিত হলেও এর অভিঘাত কেবল একটি মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আবারও সামনে এনেছে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা—শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সবসময় অচেনা নয়, বরং পরিচিত পরিবেশের ভেতর থেকেই আসতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু সুরক্ষা এখন কেবল পারিবারিক দায়িত্ব নয়; এটি সামাজিক সচেতনতা, মানসিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতার সম্মিলিত পরীক্ষা।


অভিযুক্তের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ জনমনের ক্ষোভের প্রতিফলন হলেও এটি একই সঙ্গে আইনের শাসনের প্রতি আস্থার সংকটকেও নির্দেশ করে। অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া যতই তীব্র হোক, তা যেন বিচারব্যবস্থার বাইরে না যায়—এ বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নিশাত জাহান আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তার মৃত্যু রেখে গেছে এক অনিবার্য প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পারছি, নাকি প্রতিটি ঘটনার পর কেবল বিস্মৃতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, আগামী দিনে আর কোনো শিশুর জীবন এভাবে নিভে যাবে কি না।

Post a Comment

0 Comments