গোয়ালনগরে নির্বাচনী বিরোধের আগুন, দুই দফা সংঘর্ষে প্রাণ গেল ২ জনের

 গোয়ালনগরে নির্বাচনী বিরোধের আগুন, দুই দফা সংঘর্ষে প্রাণ গেল ২ জনের



জহির শাহ্, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি | ২৪ মার্চ ২০২৬


ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জমে থাকা বিরোধ শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে দফায় দফায় চলা দুই পক্ষের সংঘর্ষে দুই জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ। দুর্গম হাওরপথের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়ায় পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হয়, আর দুপুর গড়ানোর আগে পর্যন্ত এলাকা ছিল চরম উত্তপ্ত।


পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গোয়ালনগর ইউনিয়নের রহিম মিয়া ও কাশেম মিয়ার পক্ষের মধ্যে নির্বাচনী বিরোধকে ঘিরে এই সংঘর্ষের সূচনা হয়। সকালে গোয়ালনগর উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনরত এক কর্মকর্তাকে জাল ভোটে প্ররোচনার অভিযোগে রহিম মিয়ার সমর্থক জিয়া মিয়াকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আটক করে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ১০ দিনের কারাদণ্ড দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই দুই পক্ষের মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে, আর সেই ক্ষোভই পরে সংঘর্ষের জ্বালানি হয়ে ওঠে।


স্থানীয়দের ভাষ্য, জিয়া মিয়া ১০ দিন কারাভোগের পর ১৭ মার্চ এলাকায় ফিরে এলে রহিম মিয়া ও কাশেম মিয়ার পক্ষের বিরোধ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সেদিনও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, যাতে অন্তত অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার আবারও দফায় দফায় সংঘর্ষ শুরু হয়। সকাল থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনা ক্রমে বিস্তৃত হয়ে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। ঘটনাস্থলেই আক্তার মিয়া (৪৫) ও মাওলানা হাবিবুল ইসলাম (৩৫) নিহত হন। নিহত হাবিবুল ইসলাম গোয়ালনগর ইউনিয়ন ইসলামিক ফ্রন্টের সভাপতি ছিলেন।


আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই গুরুতর বলে জানা গেছে। তাদের নাসিরনগর সদর, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম এবং ভৈরবের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, সংঘর্ষের সময় মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। হাওরবেষ্টিত দুর্গম ভূপ্রকৃতি, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং তাৎক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা সহায়তা পৌঁছাতে বিলম্ব—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে সময় লেগে যায়।


এদিকে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলের দিকে রওনা দিয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) আব্দুর রউফ সংঘর্ষে দুই জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এখনও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তিনি জানান, দুর্গম হাওরপথের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি করছেন, তবে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।


স্থানীয়দের মতে, নির্বাচনী বিরোধ, পারিবারিক-গোষ্ঠীগত বিভাজন এবং একের পর এক পাল্টাপাল্টি ঘটনার জমাটবাঁধা অভিঘাতই গোয়ালনগরকে আজ এই সহিংসতার মুখে দাঁড় করিয়েছে। এখন প্রশ্ন, এই সংঘর্ষের দায় কেবল তাৎক্ষণিক উত্তেজনার, নাকি এর পেছনে জমে থাকা দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাই মূল কারণ। নির্বাচনী মৌসুমে এই ধরনের রক্তপাত শুধু একটি ইউনিয়নের সংকট নয়; বরং মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং জননিরাপত্তার বাস্তব সক্ষমতাকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

Post a Comment

0 Comments